নিজস্ব সংবাদাতা, কলকাতা: ক্যালেন্ডার বলছে মহালয়ার এখনও প্রায় সত্তর দিন বাকি। গরমের তীব্রতা আর বর্ষার আর্দ্রতাকে উপেক্ষা করে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী কুমোরটুলির অলিগলিতে এখন থেকেই বইতে শুরু করেছে শারদোৎসবের সুবাস। তুলির শেষ টান, খড়-মাটির পরত আর প্রতিমা শিল্পীদের নিপুণ হাতের জাদুতে জীবন্ত হয়ে উঠছে মৃণ্ময়ী রূপ। বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে এখন থেকেই চূড়ান্ত ব্যস্ততার ছবি ধরা পড়েছে কুমোরটুলির প্রতিটি স্টুডিওতে।
শিল্পের ছোঁয়ায় প্রাণ পাচ্ছে প্রতিমা
সকাল থেকে রাত—প্রতিটি শিল্পালয়ে এখন চলছে কর্মযজ্ঞের এক অন্তহীন স্রোত। বাঁশ-খড় দিয়ে কাঠামো বাঁধার কাজ পেরিয়ে এখন চলছে মাটির প্রলেপ দেওয়ার এবং নিখুঁত রূপ দেওয়ার কাজ। শিল্পীদের হাতের ছোঁয়ায় মা দুর্গার চালচিত্র এবং প্রতিমার অবয়ব পেতে শুরু করেছে এক নিখুঁত রূপ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকা কারিগরদের কাছে এই সময়টা কেবল পেশাগত ব্যস্ততার নয়, বরং এক মানসিক সাধনার সময়।
দেশ ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও জাঁকজমক
কুমোরটুলির শিল্পকর্ম আজ আর কেবল পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সামুদ্রিক দূরত্ব বা ভিনদেশি সংস্কৃতির সীমানা পেরিয়ে সুদূর আমেরিকা, ইউরোপ, ব্রিটেন এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকেও বাঙালি প্রবাসী পুজো কমিটিগুলির পক্ষ থেকে আসছে প্রতিমার বরাত। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিখুঁতভাবে এই সমস্ত প্রতিমা বিদেশে থাকা পুজোকমিটিগুলির কাছে পৌঁছে দিতে হবে। আর সেই লক্ষ্যেই কোনো রকম বিরতি না নিয়ে কাজ করে চলেছেন এখানকার প্রবীণ ও নবীন শিল্পীরা। কারিগরদের একাংশের মতে, আন্তর্জাতিক অর্ডারের চাপ থাকায় কাজের পরিধি ও গতি—দুটিই বাড়িয়ে দিতে হয়েছে বহুগুণ।
অক্লান্ত পরিশ্রম ও শিল্পীদের না বলা কথা
মা দুর্গার রূপ নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলার এই ঐকান্তিক প্রচেষ্টা সত্যিই প্রশংসনীয়। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যেভাবে তপ্ত স্টুডিওর মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করে চলেছেন শিল্পীরা, তা এই উৎসবের আসল প্রাণশক্তি। কাঁচামালের ক্রমবর্ধমান দাম এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও শিল্পের প্রতি ভালোবাসা আর ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদেই তারা এই পেশাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। দুর্গাপূজার ঠিক প্রাক্কালে এই প্রতিমা শিল্পীদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সাধনাকে কুর্নিশ জানাচ্ছে গোটা রাজ্য।
মণ্ডপে মণ্ডপে আবাহনের অপেক্ষা
কুমোরটুলিতে প্রতিমা গড়ার প্রাথমিক ও মূল কাজগুলি শেষের পথে। এরপর একে একে শুরু হবে প্রতিমা বায়না অনুযায়ী নির্দিষ্ট গন্তব্যে বা মণ্ডপে পাঠানোর পালা। প্রতিমা স্থানান্তরিত হওয়ার পর শুরু হবে মণ্ডপ সজ্জা এবং আলোকসজ্জার কাজ, যা শারদোৎসবের আনন্দকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। শিল্পীদের হাত থেকে প্রতিমা এবার ধীরে ধীরে পা রাখছে শহরের নানা প্রান্তের জাঁকজমকপূর্ণ মণ্ডপে মণ্ডপে, যেখানে ভক্তরা মা'কে বরণ করে নেওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছেন।
সব মিলিয়ে, বাঙালির প্রাণের পুজোকে ঘিরে শহর কলকাতার পারদ চড়তে শুরু করেছে। কুমোরটুলির ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের হাত ধরেই ফের একবার প্রমাণিত হল, যতই আধুনিকতার ছোঁয়া লাগুক না কেন, মাটির গন্ধমাখা এই শিল্পসত্তাই বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসবের মূল ভিত্তি।
ছবি সৌজন্যে : সুস্মিতা সরদার